চট্টগ্রামের দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়নের নির্দেশনায় আলীকদম জোনের উদ্যোগে আয়োজিত “প্রাথমিক চিকিৎসা ও নার্সিং প্রশিক্ষণ–২০২৬” সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গত ০৫ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত পরিচালিত এই সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমুখী প্রশিক্ষণের সমাপনী অনুষ্ঠান রবিবার ১৯ এপ্রিল এক সুশৃঙ্খল, প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে স্থানীয় জনগণের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং তাদের জন্য সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
আলীকদম উপজেলার ২২টি পাড়া থেকে আগত ২৬ জন প্রশিক্ষণার্থী, যার মধ্যে ০৯ জন নারী ও ১৭ জন পুরুষ, অত্যন্ত আগ্রহ, নিষ্ঠা ও উদ্দীপনার সঙ্গে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। শেখার প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জনের দৃঢ় প্রত্যয় পুরো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত, ফলপ্রসূ ও অনুপ্রেরণামূলক। ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে।
প্রশিক্ষণে আলীকদম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি আলীকদম সেনা জোনের মেডিকেল অফিসারগণ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে বিভিন্ন জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে দক্ষ করে তোলা হয়। এর মধ্যে ছিল—আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, ভাঙা অঙ্গের পরিচর্যা, অচেতন রোগীর ব্যবস্থাপনা, অগ্নিদগ্ধ রোগীর সেবা, সাপের কামড়ে করণীয় এবং পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। বাস্তবধর্মী অনুশীলনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এসব গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জোন কমান্ডার, আলীকদম জোন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক, এসপিপি, পিএসসি। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন,
“মানবিক সহায়তা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অঙ্গীকার। এ ধরনের প্রশিক্ষণ মানুষকে শুধু সচেতনই করে না, বরং জীবন রক্ষায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম করে তোলে।”
তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের আহ্বান জানান, অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা নিজ নিজ এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে জনসেবায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মনজুর ইসলাম, স্থানীয় চিকিৎসকবৃন্দ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা।
সমাপনী পর্বে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদপত্র ও প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি, প্রশিক্ষণ সমাপনান্তে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বহনের জন্য একটি করে ফার্স্ট এইড ব্যাগ প্রদান করা হয় এবং ভবিষ্যতে জনসেবায় সক্রিয় ভূমিকা পালনে তাদের উৎসাহিত করা হয়।
আলীকদম সেনা জোনের এই মানবিক ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দুর্গম এলাকায় যেখানে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন, সেখানে এ প্রশিক্ষণ একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন পাড়ায় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে জরুরি চিকিৎসা সেবা এবং মাতৃ ও শিশুসেবা সহজলভ্য হয়ে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আলীকদম জোন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় বান্দরবান রিজিয়নের নির্দেশনায় পরিচালিত এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের আস্থা ও ভরসাকে আরও সুদৃঢ় করেছে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করেছে।